ঘোরটা কিসের তিনি বুঝতে পারছেন না। ঘুম ও জাগ্রত এই দুই অবস্থার মাঝামাঝি তিনি অবস্থান করছেন। এমনটা হওয়ার কারণ কী? আশরাফ মাহমুদের কাছে মনে হচ্ছে মস্তিষ্ক অতিরিক্ত ক্লান্ত। তাকে বিশ্রামের সুযোগ দিতে হবে। বাসায় গিয়ে আজকে তাড়াতাড়ি ঘুমাতে হবে। বাসে ঘুমিয়ে পরলে হয়তো সে চোখ খুলে দেখবে, সে কোন অচেনা এক জায়গায় এসে পড়েছে। সেখান থেকে তাকে দ্বিগুণের বেশি ভাড়া দিয়ে আবার বাসায় যেতে হবে। এই ভয়ে তিনি চোখ বন্ধ করছেন না। একবার তিনি যাত্রাবাড়ী থেকে তুরাগ বাসে উঠে রামপুরা ব্রিজ নামবেন। কিন্তু তাকে নামতে হলো হাউজবিল্ডিং। কারণটা এই ঘুমদোষ। এখন তিনি অনেক কষ্টে নিজেকে জাগ্রত রাখতে চেষ্টা করছেন। কিন্তু চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর্যায়ে। গুলিস্তান মাজার আসতে বেশি সময় লাগবে না যদি এই জ্যাম কেটে যায়। এই জ্যামে একটুখানি রাস্তার জন্য এভাবে বসে ঘুম আসার আগেই নেমে যেতে হবে। হাঁটলে ঘুম চলে যাবে। বাস থেকে অনেক কষ্টে মানুষগুলোকে ঠেলে-হেচড়ে তিনি নামলেন। বাস থেকে নামার পর তার কাছে মনে হলো প্রায় সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। কিন্তু তিনিতো সকাল ১০ টায় বাসে উঠলেন আর তিনি সর্বচ্চ গেলে এক ঘন্টা বাসে ছিলেন। এক ঘন্টায় সন্ধ্য হয়ে গেলো নাকি? হয়তো আবহাওয়া খারাপ। আশরাফ মাহমুদ আকাশে তাকালেন। কি আশ্চর্য! আকাশে মেঘের কোন জটলা নেই। তাহলে কি সত্যিই সন্ধ্যা ঘনিয়েছে। না, সন্ধ্যা হবে কেনো। হয়তো তার ক্লান্ত মস্তিষ্ক কম্পিউটারের মতো রিস্টার্ট নেয়ার প্রকিয়ায় আছে, কাল রাতে তার ঘুম হয়নি, মানসিক পরিশ্রম হয়েছে অনেক। কলেজের ৩০০ খাতা দেখেছেন। তাকে মানসিক যুদ্ধ করতে হয়েছে গতকাল রাতে। আর আজ সকালে পরীক্ষার খাতাগুলো কলেজে পৌছে দিতে হলো।
আশরাফ মাহমুদ পকেট থেকে তার স্মার্টফোনটি বের করে পাওয়ার বাটন চাপ দিয়ে ডিসপ্লে অন করে সময়ের দিকে তাকাতেই তার চোখগুলো আরো ঘোলাটে হয়ে যেতে লাগলো। 5:20 PM Saturday, October 11, 2017। কিন্তু তিনিতো আজ সকালেও তারিখ দেখলেন, 9 October 2017।
তার মনে হতে লাগলো তিনি এখনে রাস্তায় মাথা ঘুরিয়ে পড়ে যাবে। তিনি একটা রিক্সা নিলেন। রিক্সাটা যে পথ দিয়ে যাচ্ছিলো তার মনে হলো এটা ভুল পথ। তিনি এতটাই ক্লান্ত যে তার মনে হচ্ছিলো তিনি পথও ভুলে গেছেন। আশরাফ সাহেব অবশেষে তার বিল্ডিং - এর সামনে নামলেন। তিনি দ্রুত সিরি বেয়ে তিন তলা গেলেন। অবাক করা বিষয় তিনিতো সকালে গেছেন তালা মেরে। তার পরিবারের সবাই এখন ময়মনসিংহ আছেন। তাহলে কে তালা খুলে ভিতরে গেলো? চাবিই বা পেল কোথায়? তিনি কলিং বেলে বার বার চাপতেই থাকলো। একটা মধ্য বয়স্ক লোক দরজা খুললো। কিন্তু লোকটাকে সে কখনো দেখেননি, জানেন না। তাহলে তার বাসায় তিনি করে থুকলেন। আশরাফ মাহমুদ বললো, ‘‘আপনাকেতো চিনলাম না?’’ লোকটি বললো, ‘‘আশরাফ ভালোই মজা করতে পারো। শোন, আমাকে চেনা লাগবে না। এখন বলো তোমার বাবা-মাকে ঠিক-ঠাক মতো পৌছে দিয়েছো তো? ’ আশরাফ মাহমুদ মাথা নাড়ালেন। তারপর বললেন, ‘‘আমিতো আপনাকে চিনি না। অথচ আপনি আমার রুমে কেনো? ’’
লোকটি বললো, ‘‘আশরাফ তুমি কি কিছু খেয়ে আসছো নাকি এই সন্ধ্যা বেলায়! আমরা আজকে এতটা বছর একসাথে থেকে আসছি। আর তুমি আমাকে বলতেছো চিনো না। আর তোমার ফ্লাটতো এটা না, তোমার ফ্ল্যাট ডান পাশেরটা। ঐ দেখো তোমার দরজায় কত বড় তালা ঝুলতেছে।’’ আশরাফ মাহমুদ লজ্জিত হলেন। তিনি তার দরজা খুলে তাড়াতাড়ি আগে গেলেন গোসল করতে। গোসল শেষ করে তিনি না খেয়েই শুয়ে পড়লেন। ঘুমের মধ্যে তার এমন মনে হচ্ছে সে বাতাসে উড়ছে আবার মনে হচ্ছে ছাদ থেকে পড়ে যাচ্ছে। এমন স্বপ্নের মানে কী? তার মনে হচ্ছে তিনি ঘুমে নয় বাস্তবে আছেন। ছাদ থেকে পড়ে যেতেই তার স্বপ্নের সাথে ঘুম ভেঙে গেলো। তিনি কি সত্যিই ঘুমে ছিলেন। মাত্র ঘুমাতে না ঘুমাতেই মনে হলো রাত থেকে সকাল হয়ে গেলো। সকালের আলো। জানালা খোলা, কাক ডাকার আওয়াজ আসছে। আজ কলেজে টিচার্স মিটিং হবে।
আশরাফ মাহমুদকে সেখানে উপস্থিত থাকতেই হবে। কয়টা বাজে দেখে নেয়া দরকার। 7.00 AM. চিন্তা নেই নয়টার আগে পৌছানো সম্ভব। তিনি সকাল সকাল গোসলে সেরে আসলেন। মনে হচ্ছে ঘুম এখনো পরিপূর্ণ হয়নি। গোসল করার পর আবারও ঘুমের রেশ অনুভব হচ্ছে। তিনি এখন প্রস্তুত হয়ে বের হবেন। আবারও স্মার্টফোনের ঘরির দিকে চোখ বুলিয়ে নেয়া দরকার। হ্যা, সবঠিক আছে। তবে তারিখটা ছাড়া। এখনো সেই 11 October। তার ধারণা তারিখটা কোন কারণে সেটিং নষ্ট হয়ে গেছে। তিনি বাসা থেকে বের হয়ে দরজা তালা লাগাবেন। তখন তার মনে হলো তারিখ নয় তার মাথাই নষ্ট হয়ে গেছে। কারণ তিনি কাল সন্ধ্যায় ধরে নিয়েছিলেন ঘুম এবং ক্লান্ততার কারণে তার রুম পরিবর্তন হয়ে গেছে। কিন্তু এখন দেখছেন গতকাল যেমন দেখছিলেন উল্টো, সব তেমন উল্টোই আছে। তাড়াতাড়ি করে বের হলেন। তার মনে হচ্ছে রাস্তাগুলো অচেনা। অচেনাও না, আসলে সব উল্টো। তার ব্রেইন অনেক উদ্বেগে আছে। তিনি রিক্সা নিলেন। রিক্সা থেকে নেমে হেটেলে নাস্তা সেরে তারপর বাসে উঠলেন। বাসে বসে তিনি ভাবছেন, বাসটা ঠিক জায়গাতেই যাচ্ছে। হয়তো যাচ্ছে, কিন্তু উল্টো। তার চোখ আবার গতকালের একরাশ ঘুম এসে বুলিয়ে দিচ্ছে চোখের পাতা। এত সময় ঘুমানোর পরও এমনটা হওয়ার কারণ কী? কারণ কিছুই না, বাসে উঠলে ঘুম চড়বেই। তিনি এমন এক ঘোরে আছে। ঘোরটা ঘুম এবং জাগ্রত এই দুই অবস্থার মাঝামাঝি সময়ের। হঠ্যাৎ হেলপারের ডাকে ঘোর ভাঙল। তাড়াতাড়ি চশমাটা ঠিক করে নামলেন তিনি। সব ঠিকই আছে। সঠিক সময়ে উপস্থিত থাকা যাবে। স্মার্টফোনের পাওয়সর বাটন চাপ দিয়ে স্ক্রিনটা অন করা হলো সময় দেখার জন্য। 1.01 PM, Thursday, October 9, 2017। একি হচ্ছে, তিনি ভাবনায় ফেটে গেলেন। আকাশ যেন তার মাথার একহাতে উপরে। এগুলো কিভাবে সম্ভব। তাহলে তিনি কি টাইম ট্রাভেল করেছিলেন। কিন্তু কিভাবে, কেনো এমন হলো? না, না পাগল হয়ে যাচ্ছে নাতো তিনি। ঘুমে চোখ ফেটে আসছে, তবে এটা মিথ্যা নয়। সত্য মিথ্যা জানার উপায় কী? টাইম ট্রাভলের বিপক্ষে তিনি তার ছাত্রদের কথা বলেন। পরবর্তী ক্লাসে কি তাদের বলতে বাধ্য হবেন, He is a time traveler।
না, কেউ বিশ্বাস করবেন না। বলবে, স্যারের মাথা গেছে। কিন্তু কোন মাধ্যমে তিনি টাইম ট্রাভেল করছেন। তিনি কি প্যারাডক্স ইউনিভার্সে ছিলেন। তাহলে এটা সম্ভব হওয়ার পিছনে কি কোন অদৃশ্য ডাইমেনশনাল কিছু দায়ী। কিন্তু জোরাল যুক্তি নেই। তার অবস্থান থেকে তিনি আবার ফিরে এলেন কি করে? পরস্পর ইউনিভার্সের সমান্তরাল পথে কি সময়ে কোন গোলমাল হয়েছিলো। আশরাফ মাহমুদের মাথা কাজ করছে না। তার মস্তিষ্ককে বিশ্রাম দিতে হবে তারপর এই বিষয়ে খাতা কলমে ভাবতে হবে। তিনি রিক্সা নিলেন। রুমের সামনে দাড়িয়ে ভাবছেন। এটা কি তার রুম নাকি তার আরেক জগতের রুমের মতো বিপরীতেরটা তার রুম। এটাতেই তালা ঝুলছে। তাহলে সব ঠিক আছে। তিনি বুঝতে পারছেন তার গোসল করা প্রয়োজন। গোসল শেষ করে বিছানায় শুলেন। তিনি ভাবছেন, আগামী ১১-ই অক্টোবর তাহলে তার অবস্থানে কে থাকবে। এই প্যারাডক্সের কারণ এবং সমাধান কিছুই তার জানা নেই। তবুও তিনি অপেক্ষায় আছেন ১১-ই অক্টোবরের জন্য।



0 Reviews:
Post a Comment