সফলতার মন্ত্র
সফলতা। আমরা প্রত্যেকেই সফল হওয়ার জন্য অনেককিছুই ত্যাগ করতে প্রস্তুত। কিন্তু না, আমরা শেষ পর্যন্ত কেউই সেটা ধরে রাখতে পারি না। আমরা শেষ পর্যন্ত দৌড়াতে পারি না। কিন্তু কেন? কারণ দৌড়াতে দৌড়াতে আমরা পিছনে ফিরে তাকাই। স্বাভাবিকভাবেই দৌড়ানোর সময় পিছনে তাকালে সামনে দুর্ঘটনা ঘটবেই। তেমনি আমরা যখন আমাদের সফলতার পিছনে দৌড়াতে গিয়ে পিছনে ফিরে তাকাই, তখন আমাদেরও সফলতার রাস্তায় দুর্ঘটনা হবেই। আচ্ছা আমাদের পিছনে কী থাকে যে তাকালেই আমাদের দুর্ঘটনা ঘটে। পিছনে থাকে অতীত, সমালোচক, নিন্দুক, ব্যার্থতা। আপনার চলার পথে যেটাকে লক্ষ্য স্থির করে ছুটবেন, সেটা নিয়েই নিন্দুক সৃষ্টি হবে, সমালোচনা করবেই। সমাজে চলতে গেলে সমালোচনার ভিতর দিয়ে যেতেই হবে। তবে আপনি এসব কান দিয়ে শুনেই যাবেন কিন্তু কখনো মাথার মেমোরি সোলে জমা করবেন না। জমা করা মানেই সফলতার রাস্তায় পিছনে তাকানোর কারণ। আর পিছনে তাকানোর পরিণতি বিফলতা।
সমাজের মানুষগুলো বলবেই, আপনি তাদের মুখ সুই-সুতা দিয়ে সেলাই করতে পারবেন না। পারবেন না সমালোচনা করার জন্য তাদের নামে মামলা করতে। কিন্তু একটা জিনিস পারবেন, সেটা হলো প্রবাদে যাকে বলে, ‘এক কানে শুনা, অন্য কানে বের করা’। হ্যা, আপনাকে এক কানে শুনে অন্য কানে বের করতে হবে তার মাঝের সময় এটা কোনভাবেই মাথায় ঢুকাবেন না। সমালোচক বলবেই, আপনি উঠতে-বসলে, খেতে-ঘুমাতে কোনকিছু করতে গেলেই সে বলবে, এটা কেনো করলে, এটা ভালো না, এটা দিয়ে কিছু হবে না। একটা উদাহরণ দেই। আপনার ভবিশ্যত উদ্দেশ্য বা আপনার ভাষায় ‘Aim in life’ যাই বলেন না কেন, আপনার উদ্দেশ্য আপনি গায়ক/গায়িকা হবেন। এখন আপনার বাবার বন্ধু যদি জিজ্ঞাস করলো---‘বাবা তোমার Aim in life কী?’ তাকে যদি উত্তরে বললেন, ‘আমি গায়ক/গায়িকা হবো।’ তখন তিনি চেহারার ভঙ্গি পরিবর্তন করেই আপনাকে উপদেশ দেয়া শুরু করলো--- এটার কি কোন ভবিশ্যত আছে; তোমাদের সময় আমাদের স্বপ্ন ছিলো ডাক্তার হবো, ইন্জিনিয়ার হবো; পড়াশোনায় মনোযোগ দাও, সামনে তোমার সেমিস্টার পরীক্ষা ইত্যাদি ইত্যাদি। আচ্ছা, সেই আঙ্কেলের স্বপ্ন কী সত্যি হয়েছে-- তিনি কি ডাক্তার, ইন্জিনিয়ার হয়েছে? তিনি কি তার স্বপ্নের বা তার শখের ভবিশ্যত গড়তে পেরেছেন? -- না পারেনি। তাহলে তার এই উপদেশ অর্থহীন। সেটা তার স্বপ্ন ছিলো না। সেটা অর্থ উপার্জনের লক্ষ্য ছিলো, সেটা জীবনের লক্ষ্য ছিলো না। তিনি যদি সত্যিই তার স্বপ্ন নিয়ে পড়ে থাকতেন, স্বপ্নের জন্য কাজ করতেন, পরিশ্রম করতেন অবশ্যই তিনি সেটাতে সফল হতে পারতেন। সবাই সব বিষয়ে পারদর্শী না। আপনি যেটা ভালো পাড়েন, যেটাতে আপনার পারদর্শিতা, আপনার প্রতিভা, যেটা আপনার ঘুমিয়ে দেখা স্বপ্ন না, আপনার প্রাণের স্বপ্ন সেটা নিয়েই পরিশ্রম করেন। এখন আপনি যদি আপনার বাবার বন্ধুর কথায় মন খারাপ করে দমে জান, গান বন্ধ করে দিয়ে পড়াশোনা করছেন ঠিকই, তবে হতাশ হয়ে। এই হতাশ পড়াশোনার মূল্য নেই, এই বিদ্যা পরীক্ষার খাতায় নিজেকে যোগ্য প্রমাণ করবেনা। যে বিদ্যা করবে তা হলো, জীবন থেকে নেয়া বিদ্যা। আপনি হতাশ না হয়ে যদি আপনার মতো করে আপনার গান চালিয়ে যান কে জানে আপনিওতো হয়ে যেতে পারেন, আগামীর কিংবদন্তি।
গায়ক ছোট থেকেই গানকে ভালোবাসতো, বিড় বিড় করে গান গাইতো, শিল্পী ছবি আঁকতে পছন্দ করতো, কবি কবিতাকে ভালোবাসতো, খাতার পৃষ্ঠার এপিঠ-ওপিঠ অর্থহীন কবিতা লেখে ভরে ফেলতো, সে-ই ভবিশ্যতে কবিতার নতুন মোর সৃষ্টি করলো। আপনি কাঠাল গাছে উঠতে পারেন, সুপারি গাছে না। এখন যদি সুপারি গাছে কেউ আপনাকে বাধ্য করে উঠতে বলে, তাহলে বার বার আপনি উঠার ব্যর্থ চেষ্টাই করবেন। কিন্তু যে আপনাকে বাধ্য করলো তিনিতো বুঝতে চাইবে না- আপনি সুপারি গাছে উঠতে পারেন না। কিন্তু এখন যদি আপনাকে কাঠাল গাছে উঠতে দেয়া হয় আপনি অন্যসকলের চেয়ে তাড়াতাড়ি উঠতে পারবেন। তাহলে, ভেবে দেখুন সুপারি গাছে উঠার ব্যর্থ চেষ্টায় আপনার সময়, পরিশ্রম দুটোই অপচয় হলো। এই সময়টা আপনি কতবার কাঠাল গাছে উঠতে-নামতে পারতেন হিসাব করুন এবং আপনার পারদর্শিতাও বৃদ্ধি পেত।
আপনি যে বিষয়ে পারদর্শী, সেই বিষয় নিয়ে পড়ে থাকেন বা আপনার যেটা ভবিশ্যত পরিকল্পনা শুধু সেটাতে পরিশ্রম দিন। দুই নৌকায় পা রেখে মাঝখানে ভারসাম্য রেখে বেশিক্ষণ চলা যায় না।
জীবনের প্রত্যেকটা পদক্ষেপও ঠিক সেরকম। যে বিষয়ে মননিবেশ হবেন, সেটাতে আগ্রহের সাথে পরিশ্রম দিবেন। নিন্দুক বা সমালোচক তার মতো করে বলতেই থাকবে। সেভাবে আপনাকে আপনার কাজ করেই যেতে হবে।
অতীত আপনার পিছন ফিরার আরেক কারণ। একটা কাজে সিদ্ধান্ত নিলেন, আপনি এই কাজটা করবেন। কিন্তু কিছুদিন করার পর ভাবলেন-- আমারতো অতীতের কিছু খারাপ কাজ আছে। আমিতো অতীতে ওই কাজটা করতে পারি নাই। আমিতো অতীতে এই ছিলাম, ঐ ছিলাম ইত্যাদি ইত্যাদি। আবার আপনি কোন একটা কাজ করতে গেলেন; একটা উদাহরণ দিচ্ছি---আপনি আপনার বন্ধুর সামনে বললেন- ‘এখন আমি পড়াশোনায় অনেক সিরিয়াস হবো আর হেলামি, আড্ডা নয়।’ তখন আপনার বন্ধু আপনাকে বললো-- ‘এই কথাটা তুই গতবার আরো কয়েকবার বলছিস। তুই অতীতেও এটা পারিস নাই, বর্তমানেও পারবি না।’ আপনি যদি সত্যিই এবার পড়াশোনায় মনোযোগী হতে চান তাহলে আপনি তাকে এই কথাটা বলতে পারেন-- অতীতে কী ছিলাম, সেটাতে অতীতেই ছিলাম। অতীতে কী হয়েছিলো সেটা অতীতেই হয়েছিলো। বর্তমান সময় এটা, বর্তমান নিয়ে কথা বল। অতীত, বর্তমান দুটো আলাদা। অতীত অতীতকে প্রভাবিত করে আর বর্তমান বর্তমানকে প্রভাবিত করে।
অতীত নিয়ে মাথা ঘামিয়ে কোন লাভ নেই। অতীতের কাজের ফল অতীতে পেয়েছি। আর বর্তমানের কাজের ফল ভবিশ্যতে পাবো তাই কিছু করার হলে বর্তমানে করতে হবে ভবিশ্যতের জন্য।
আপনি একটা উদ্দেশ্য চূড়ান্তভাবে নিলেন। আপনি এখন করবেনই করবেন কিন্তু করতে পারছেন না। ফল পাচ্ছেন শূন্য অর্থ্যাৎ বিফল বা ব্যর্থতা। ব্যর্থতার স্বাদ গ্রহণ না করলে কি করে জানবেন সফলতার স্বাদ। প্রত্যেকটা সফল মানুষের গল্পের পিছনে শতশত ব্যর্থ গল্প রয়েছে। আপনি ইতিহাস পড়ে দেখেন। একজন সফল মানুষের জীবনী পড়ে দেখেন সে কতবার বিফল হয়ে সফলতা পেয়েছে। আমরা একবার ব্যর্থ হলে হাল ছেড়ে দেই, উঠে দাড়াতে পারি না। আমাদের ভয় হয় যদি আবার ব্যর্থ হই। যতবার ব্যর্থ হবো ততবেশি সফল হওয়ার আশঙ্কা জন্মাবে। সফলতার রাস্তায় পৌছাতে হলে ব্যর্থতার রাস্তা দিয়ে যেতে হয়। যে ব্যক্তি ব্যর্থ না, সে কখন সফল না।
আজই নিজেকে তৈরি করে নিন। করবেন করবেন ভেবে ভাবনা পর্যন্ত শেষ করে না দিয়ে, করে দেখিয়ে দিন- আপনিও পারেন। আপনার নিজের প্রতিভা তৈরি করে নিন, ব্যর্থ হয়ে সফল হওয়ার মাধ্যমে। নিন্দুকেও বলতে দিন। একদিন নিন্দুকের মুখ থেমেও থামবে না। কারণ সে দিন সে আপনার সফলতা দেখে ঈর্ষা করে বলবে। পরিশ্রম, অধ্যবসার করে নিজের ভাগ্য নিজে গড়ুন। আপনিও আপনার ভাগ্যকে তৈরি করে নিন, বিলগেটসের মতো, আইনস্টাইনের মতো, ভুজিসিকের মতো, এরিস্টটলের মতো, ইশ্বরচন্দ্রের মতো। আর উদাহরণ দিবো না, আপনি নিজের ভাগ্য নিজে তৈরি করা শুরু করুন, আপনি নিজেই একজন উদাহরণ হয়ে যাবেন।
-
লেখা- মেহেদী হাসান হাসিব


0 Reviews:
Post a Comment